
প্রকৃতির বিরূপ প্রভাব ও দায়বদ্ধতা: একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।
পরিবেশ অবক্ষয় বিশ্বব্যাপী এখন চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে। যেভাবে নদ-নদী বনাঞ্চল ও জীববৈচিত্র ধ্বংস হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে নির্ঘাত পরিবেশ সংরক্ষণে জরুরি অবস্থা ঘোষণার সময় এসেছে। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশও আজকে একটি দাবানল নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। বাংলাদেশের তরুণ সমাজ দীর্ঘ অন্যায়ের বিরুদ্ধে, যারা দেশকে ঐক্যবদ্ধ করেছে সেই তরুণদের পরিবেশ ও মানবাধিকার সুরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ করে আরেকটি যুদ্ধে এবং রাষ্ট্র ও প্রশাসনকে জনমানুষের কাতারে এনে দেশ রক্ষার ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। আর তা না হলে এই মহা ধ্বংস থামবে না।
একদা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ধরিত্রী মাতার অপার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বিদগ্ধ কাব্যরসে সিঞ্চিত হয়ে রচনা করেছিলেন তাঁর নান্দনিক কবিতা, তাঁর লেখনীতে সেদিন বিশ্ব বন্দনা মূর্ত হয়ে উঠেছিল,-
আমার পৃথিবী তুমি বহু বর্ষের
তোমার মৃত্তিকা সনে
আমারে মিশায়ে লয়ে অনন্ত গগণে
অশান্ত চরণে করিয়াছ প্রদক্ষিণ (বসুন্ধরা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
আর আজ! কবির মননের সেই বিশ্বমাতা ‘পৃথিবী’ আছে। কিন্তু তাঁর বৈষয়িক সবকিছুই যেন হারিয়ে যাচ্ছে! এই মায়ের সন্তান যে মানুষ, যারা তার রূপ রসে পেয়ে তার এই অপত্য স্নেহে লালিত হয়ে আসছে, তারাই নিষ্ঠুর হাত উঁচিয়ে মায়ের সবকিছু ধ্বংস, লুটপাট করে নিচ্ছে। মানুষ হয়ে মানুষের শান্তির নিবাস, তার হিরণ্ময় পরিবেশ বিষাক্ত করে তুলছে। কি প্রাকৃতিক, কি সামাজিক, কি রাজনৈতিক, সবকিছুকে আজ মানুষের করাল থাবা বাহুর মতো জেঁকে ধরেছে। যেন সব কিছুর অনিবার্য ধ্বংস আজ সকলের কাম্য। সকলের সাধনা।
চিরায়ত সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের এই গ্রহ। এই পৃথিবী। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শূন্য মহাশূন্য বিজ্ঞানীরা আজও হন্ন হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন, আর কোথাও অন্য একটি এরকম বাসযোগ্য পৃথিবী খুঁজে পাওয়া যায় কিনা। এ যাবত তারা যা কিছু তাদের অভিজ্ঞানের আয়ত্তে পেয়েছেন, পৃথিবীর উপগ্রহ চাঁদ আর প্রতিবেশী গ্রহ মঙ্গলের অনেক তথ্য ও উপাত্ত। পেয়েছেন সেখানে পাষাণময় বিস্তীর্ণ প্রান্তরের সন্ধান, বিস্তর শিলা, পাথর খন্ড, পাহাড়-পর্বত ও আগ্নেয়গিরির জ্বলা মুখের সন্ধান। আরো কত কি? আবার সম্প্রতি মঙ্গলে বরফের অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হয়েছে। তো এত কিছুই মানুষের জন্য প্রাপ্তি। ভবিষ্যতে অনেক সাফল্যের উজ্জ্বল সম্ভাবনা আসবে তাতে সন্দেহ নেই। শোনা যাচ্ছে খুব শিগগিরই মানুষ নাকি চাঁদে একান্ত নিরালয় তাদের আকাশ-যাপন কেন্দ্র গড়ে তুলবে। অর্থ, প্রযুক্তি আর জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমৃদ্ধ কোন কোন দেশ নাকি চাঁদে হোটেল তৈরি করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তা হতেই পারে। তাতে, সহসাই আমাদের প্রতিবেশী চাঁদের একাকীত্ব ঘুচে যাবে। সৌখিন পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠবে তার কক্ষপথ। নর-নারীর হাস্য কল-কাকলিতে, মিউজিক, মারদাঙ্গা এবং খাবার টেবিলের টুংটাং শব্দে মুখরিত হয়ে উঠবে চাঁদের ধূসর নির্জন প্রাঙ্গণ। বোধ করি, সেদিনও খুব বেশি দূরে নেই।
এখন প্রশ্ন, আজ মানুষের অবস্থান কোথায়? পিছনের একটি শতাব্দী অতিক্রমণ করে আর একটি শতাব্দীর সিকি ভাগে দাঁড়িয়ে, মনের পাখা মেলে মানুষ মুহুর্মুহু গতি বাড়িয়ে দিচ্ছে ঊর্ধ্বে ছুটে চলার। পৃথিবীর সীমান্ত পেরিয়ে, মধ্যাকর্ষণের অভিকর্ষের নাগালের বাইরে হবে এই পার্থিব মানুষের অবস্থান। মহাশূন্যে শুধুই ভেসে বেড়ানো। ঠিক মাছ যেমন জলে ভেসে বেড়ায়। পাখি যেমন অবাধে আকাশে উড়ে বেড়ায়। তাই মানুষ স্বপ্ন দেখে অন্য আরেকটি গ্রহের নিজের ঠিকানা ভিত রচনা করতে। এই যেমন সে দেশ থেকে দেশান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছুটে যাচ্ছে মহাকাশের খোলা জানালায়। এতকিছুর পরও, সেকি অন্য আরেকটি গ্রহে তার আবাস গড়বে না? তবে একথা ঠিক তার জানা, সে চাঁদ বা অন্য কোন গ্রহ যাই হোক না কেন; এই পৃথিবীর মতো সে আর হচ্ছে না। আকাঙ্খিত সেই গ্রহান্তরে থাকবে না গাছ, উঁচু দালানের ছাদ থেকে মাটিতে পড়ে অপমৃত্যুর সমূহ ভয়। কারণ সেখানে তো মানুষ সন্তানকে মাতৃ স্নেহে বুকে টেনে নেবার মত পৃথিবীমাতা নেই। আছে চন্দ্রমাতা।
অথবা হতে পারে মঙ্গলমাতা, তো সেই মায়েরা অভিকর্ষের তাড়নায় মানুষকে কেবল, দূরে ঠেলে দিতে চাইবে। এই আমাদের পৃথিবী মায়ের মত, বোধ করি চন্দ্র, মঙ্গল মাতৃ স্নেহে অতি দ্রুত মানুষকে নিজের বুকে টেনে নেবে না।
এখন আমরা কি দেখছি? কিছু মানুষ এই মাকেই অবহেলা করছে। পৃথিবী গাইতি মাতার চির সৌন্দর্যে নির্মম গাইতি চালিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে সবকিছু। যেন পৃথিবীতে যা কিছু আছে সমস্তই মানুষের কাছে, একান্ত অপ্রয়োজনীয় হয়ে গিয়েছে। একেবারেই বাহুল্য, পরিত্যাজ্য মনে করে দূরে ঠেলে, ছুড়ে ফেলতে চাইছে পৃথিবীর সৌন্দর্য সব। এই যেমন, চোখের নিমিষেই বন-বাদার, টিলা, পাহাড়, নদী, বিল সব উজাড় হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। সোনালী শস্যদানায় পরিপূর্ণ বিস্তীর্ণ জমি এখন নগরায়নের-
ধাক্কায় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বনের হরিণ, অমিততেজী ব্যাঘ্র-সিংহ, বিশালাকার হাতি আর অজগর, কচ্ছপ, সজারু, বানর, খরগোশ প্রাণভয়ে তারা সব কোথায় পালিয়ে যাচ্ছে।
আবার, মানুষের থাবার সামনে টিকতে না পেরে সমূলে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। মানুষের তৈরি যানবাহন, কলকারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া, যতসব বর্জ্য-আবর্জনা পৃথিবীর বাতাস ভারী করে তুলছে। সভ্যতার বর্জ্য-আবর্জনায় প্রাণের অবাধ বিচরণক্ষেত্র নালা-খাল, বিল, নদী এমনকি সাগর-মহাসাগর কলুষিত হয়ে পড়ছে।
আবার দেখি মাছসহ অন্য সমস্ত জলজ প্রাণী, এমনকি উদ্ভিদ সমূলে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বনের বৃক্ষরাজি যা মানুষ অনেক স্বপ্ন বুকে নিয়ে রোপন করেছে পরম আদরে এই ধরিত্রীকে বাঁচাবো বলে, কতক মানুষ আবার হিংস্র হায়েনার মত এগুলো নির্বিচারে কেটে নিয়ে যাচ্ছে। পাহাড়-টিলা, বন-বাদাড় কেটে উজাড় করে দিচ্ছে।
শুধু কি তাই? এই পৃথিবীর বুক বিদীর্ণ করে মানুষের এখন, নিঃসীম সূদুরের অন্তরীক্ষে থাবা মেরেছে। বলতে গেলে, বিস্তীর্ণ অবারিত মহাকাশও এখন নিরাপদ নয়। নিচের পৃথিবীকে কেন্দ্র করে দ্রুত ধাবমান বিমানের, মহাকাশযানের এবং ক্ষেপণাস্ত্রের ধোঁয়ায়, শব্দে মহাকাশ আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে। যত সমস্ত সচল, বিকল উপগ্রহ সব মিলে মহাকাশ এখন সুবিশাল ভাসমান আস্তাকুড়ে পরিণত হয়েছে। আমাদের পৃথিবীকে ঘিরে রাখা ওজনস্তর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি অবাধে সরাসরি নেমে আসছে ভূমন্ডলে। ফলে ওজোনস্তর সূর্যের ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি থেকে পৃথিবীকে ঢালের মত সুরক্ষা করতে পারছে না। এখন এই ওজোন স্তরের ভঙ্গুরতার কারণে পৃথিবী আক্রান্ত হচ্ছে নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগে। তার অধিবাসী মানুষ হচ্ছে প্রভাবিত। ক্যান্সারসহ নতুন নতুন রোগ-ব্যাধি এবং মহামারীর শিকার হচ্ছে তারা।
এই সকল অনাচার-ব্যভিচারের মর্মন্তুদ পরিণতি এই জগতের অধিবাসী সকলে প্রত্যক্ষ করেছে এবং অগ্রসরমান সভ্যতার অনিবার্য পরিণতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার এই চলমান প্রক্রিয়ার দ্রুত ধাবমান চাকার নিচে কালে কালে পিষ্ট হয়ে যাচ্ছে অসহায় প্রকৃতি-জীব- প্রাণীকুল। স্বার্থাদ্ধ এবং দূর্বিনীত চরিত্রের কিছু অর্বাচীন মানুষের দুর্বৃত্তপণার কারণেই পৃথিবীতে নেমে আসছে যত প্রাকৃতিক ঝঞ্জা। রোগ-ব্যাধি, মহামারী এই সমস্ত অপরাধের কারণে অসহায় সাধারণ মানুষকে বেঘোরে প্রাণ বিসর্জন দিতে হচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় এই পৃথিবীর আসন্ন অন্তিম দশাটাই দেখতে চায় এই দুর্বৃত্তরা। এই জগতের সকল অধিবাসীকে নির্বিবাদে, তাও প্রত্যক্ষ করতে হবে। যে বিজ্ঞান মানুষের দুঃখ মোচন করতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে সক্ষম, সেই বিজ্ঞানই মানুষকে আজ চরম অনিরাপত্তায়; রোগের শোকের আর যন্ত্রণার মৃত্যু কুপে ঠেলে দিচ্ছে।
তাই পৃথিবী মাতা আজ অস্থির। বিশ্ব প্রকৃতি চরম বিরক্ত হয়ে উঠেছে মানুষের উপর। এখন সে মেতে উঠতে চাইছে তান্ডবলীলায়। চূড়ান্ত ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে তার। তার চরম আক্রোশ নিয়ে ভেঙে চুরমার, ধুলিস্যাৎ করে দিতে চায় সে মানুষের দর্পকে। বিজ্ঞানের নামে অজ্ঞানের যত হোলিখেলা, সামাজিকতার অবক্ষয়, ভরপুর যন্ত্রণায় তাড়িত এই মানুষকেই আজ অজ্ঞাত ও দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ভুগে ভুগে জীবন দিতে হচ্ছে অকালে। এই কি তবে সভ্যতার চরম বিকাশ ও পরম প্রাপ্তি। কেউ কেউ সন্ত্রাসকে লালন করছে। তারা অন্তরালে সন্ত্রাসীদের কাছে অত্যাধুনিক মারোনাস্ত্রের যোগান দিচ্ছে। নানান ইস্যুকে পুঁজি করে এ বিশ্বকে অস্থির করে তোলার ষড়যন্ত্র করে। আবার কিছু মানুষ, সরব হয়ে উদাত্ত কণ্ঠে শান্তির ললিত বাণী দিনরাত প্রচার করে যাচ্ছেন। এই পৃথিবীতে, প্রকৃতিকে, মানব সভ্যতাকে সুরক্ষা করার আহ্বান জানাচ্ছেন তাঁরা। প্রশ্ন এখন আমরা কি করব? মানবতার কাছে, এই সমস্ত অশুভ শক্তির পরাজয় কি হবে না কোনদিন? মানব কি তার দানবীয় চরিত্র ছুড়ে ফেলে; মানব হয়ে উঠবে না?
এই যদি হয় আমাদের বিশ্বের অবস্থা, তবে এই পৃথিবীর প্রকৃতিও আর মানুষের পক্ষে থাকবে না। ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে তার বিট্রে করার পালা। এবার ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটবে বুঝি পৃথিবী মাতার। সে এখন ক্ষুদ্ধ, প্রতিশোধ পরায়না হয়ে উঠেছে। অতিবৃষ্টি, খরা, বন্যা, দাবানল, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, ভূমিধস ইত্যাদি মাতিয়ে চলছে এই পৃথিবীকে। মানুষের সভ্যতাকে প্রকৃতি সে আজ করতে চাচ্ছে দলিত-মথিত। অনাদরে সেখানে মানুষ শাণিত গাইতি চালায় প্রকৃতির বুকে আর সেখানে কত নিরবে চোখের জল ফেলা মায়ের? মা কি আর নীরব থাকতে পারে?
প্রকাশিত: (২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪- প্রথম আলো)।
(দ্বিতীয় অংশ)
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সম্মেলন কপ-২৯ (কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ) সম্মেলনের প্রথম দিনে প্যারিস চুক্তির আলোকে জলবায়ু অর্থায়নের জোর দাবি জানিয়েছে অংশীজনরা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে যেন অর্থ বাড়ানো হয় সেই দাবি জানানো হয়েছে সম্মেলনে। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর শুধু মাত্র ১.৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রার সঙ্গে আজকের চরম আবহাওয়ার প্রভাব মোকাবেলা করতে প্রতিদিন প্রায় এক বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। ক্ষতিপূরণ হিসেবে যা পাওয়া যাচ্ছে তা অপ্রতুল।
প্যারিস চুক্তি সম্মেলনে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেন, জলবায়ু সংকট থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজে বের করতে হবে। এ বিষয়ে এখনই গুরুত্ব দেওয়ার প্রকৃত সময়। অন্যদিকে জাতিসংঘের জলবায়ু প্রধান সায়মন স্টিয়েল উদ্বোধনী প্লেনারিতে তার বক্তব্য বলেন, তিনি স্টিয়েল গ্রেনেডা দ্বীপের ক্যারিয়াকাড থেকে এসেছেন, যা জুলাই ২০২৫ এ হারিকেন বেরিল
দ্বারা বিধ্বস্ত হয়েছিল। তিনি একজন বয়স্ক প্রতিবেশী, ফ্লোরেন্সের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা নিজের একটি ছবি দেখিয়েছিলেন, যার বাড়ি ঝড়ে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। জাতিসংঘের আলোচনায় ফ্লোরেন্সের মতো মানুষের ক্ষতি করে এমন পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে দূরে অনুভব করতে পারে তবুও জলবায়ু সংকট বিশ্বের প্রতিটি একক ব্যক্তিকে কোন কোনভাবে প্রভাবিত করছে, জ্বালানি শক্তির বিল বাড়িয়ে দিচ্ছে, বৈশ্বিক অস্থিতীশীলতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং জীবন কেড়ে নিচ্ছে। কপ- ২৯ এ প্রধান অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে একটি নতুন বৈশ্বিক আর্থিক লক্ষণ নির্ধারণ, কার্বন বাজারের নিয়মগুলো চূড়ান্ত করা এবং গ্রহ সতর্কতা দূষণ কমানোর প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।
এদিকে এনজিও ওয়েল ইন্টারন্যাশনালের সহ-ব্যবস্থাপক অ্যালি রোজেন ক্লথ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, জলবায়ু আন্দোলনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল ট্রাম্পের পুনঃনির্বাচন ভয়াবহ সংবাদ। ট্রাম্প তার প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদে কয়েক ডজন পরিবেশগত বিধি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। ট্রাম্পের আসন্ন ভূমিকা মার্কিন জলবায়ু কর্মপরিকল্পনা, জলবায়ু ও অর্থায়নের প্রতিশ্রুতিতে একটি বড় বাধা সৃষ্টি করতে পারে। বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যায়ন কেন্দ্রের (ক্যাম্পাস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব রোধে জরুরী পদক্ষেপ না নিলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় ২ কোটি মানুষ তাদের বর্তমান আবাসস্থল থেকে স্থানান্তরিত হবে এবং ২০৮০ সালের মধ্যে দেশটির ১৩ শতাংশ উপকূলীয় এলাকা সমুদ্রের পানির নিচে হারিয়ে যেতে পারে।
প্রতিবছর ২২ এপ্রিল বিশ্বজুড়ে ধরিত্রী দিবস পালিত হয় পৃথিবীর পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা রক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে। ২০২৫ সালের এই দিনের তাৎপর্য আরো গভীর, এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চরম মাত্রায় বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং লবণাক্ততার অভিঘাত মোকাবেলায় এখনি সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরী। বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর শীর্ষে থাকা বাংলাদেশের জন্য এ সংকট ভবিষ্যতের হুমকি এবং বর্তমানের কঠিন বাস্তবতা।
জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, এটি একটি সমগ্র জাতির যুদ্ধ। সরকারি-বেসরকারি খাত গবেষক, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ নাগরিকের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে টেকসই ভবিষ্যৎ গড়তে। বিশ্ব ধরিত্রী দিবস ২০২৫ সালে বাংলাদেশের জন্য হোক নতুন অঙ্গীকারের সূচনা, যেখানে জলবায়ু ন্যায় বিচার নিশ্চিত হবে, গ্রীন টেকনোলজিতে বিনিয়োগ বাড়বে এবং প্রতিটি নীতি পরিকল্পনা পরিবেশ হতে পারে সর্বাগ্রে। একই সঙ্গে জনসচেতনতা তৈরীর লক্ষ্যে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার কারিকুলামে জলবায়ু শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা। মিডিয়া ক্যাম্পের মাধ্যমে গ্রীন লাইফ স্টাইলকে জনপ্রিয় করা এবং যুব সমাজকে জলবায়ু ন্যায্যতার আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা গেলে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন সম্ভব। জলবায়ু সংকট মোকাবিলা কোন একক মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়, এটি বিশ্ববাসীর জন্য একটি যুদ্ধ।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন প্রতিদিনের বাস্তবতা। বাংলাদেশে প্লাবন, বন্যা, নদী ভাঙ্গন, বন উজাড়, শিল্প বর্জ্য দূষণ সবকিছুই মানবজীবনকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
জলবায়ু ও পরিবেশ দূষণের চলমান সমস্যা মোকাবেলায় দ্রুত পদক্ষেপের তাগিদ দিয়ে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলেন, বিশ্বের ধনী ও উন্নত দেশের প্রায় ১ ভাগ মানুষ যে পরিমাণ কার্বন নির্গমন করে, সেই পরিমাণ কার্বন নির্গমনের পরিমাণ খুবই নগণ্য। তারপরও প্রতিনিয়ত দেশ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিভিন্ন দুর্যোগ ও বিপদের শিকার হচ্ছে। এজন্য বিশ্বকে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি “নেট জিরো” নিয়ে কথা বলা বন্ধ করে বাস্তবতার আলোকে সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, নুরজাহান মেমোরিয়াল মহিলা ডিগ্রি কলেজ, সিলেট। লোকসংস্কৃতি গবেষক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, রাষ্ট্রচিন্তক, সমাজবিজ্ঞানী ও প্রাবন্ধিক। পিএইচডি ফেলো, নিউইয়র্ক।