আমরা মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে মিলেমিশে থাকাই আমাদের বিধান। হয়তো ভৌগোলিক অবস্হানে থাকার ধরন কারো ভিন্ন হয়।
কেউ গ্রামে, কেউ চর এলাকায়,কেউ পাহাড়ে ,কেউ বস্তিতে আবার কেউ শহরে।
যে যেখানেই বাস করে প্রত্যেকেই তার বসত ঘরসহ চারপাশ সুন্দর দেখতে চায়।
বসত ঘরের সৌন্দর্য বর্ধনে সে তার মনের সবটুকু রুচি উজার করে সাজায়। যা তার সাধ্যের সীমানায় ধরা দেয়।
তেমনি ঘরের সীমানা পেরিয়ে বাড়ির আশপাশে যখন দৃষ্টি যায়, তখন সৌন্দর্য বর্ধনের প্রধান মাধ্যম হিসাবে বৃক্ষের নাম আসে।
বাংলা সাহিত্যে যার সঠিক নাম বৃক্ষ।
আমাদের গ্রামীণ জনপদের অধিকাংশই বৃক্ষকে বলে গাছ, ইংরেজিতে বলা হয় TREE, আর আরবীতে বলা হয় شجر
এই ভিন্ন ভাষার ভিন্ন নামধারী বৃক্ষ, গাছ,ট্রি,সাজার কী?
কী তার কাজ?
তার কাছ থেকে আমরা কী পাই?
তাকে কীভাবে কতটুকু ব্যবহার করতে পারি।
এ প্রশ্নের সঠিক জবাব জানলে হয়তোবা আমরা কোন ভালো ইঙ্গিত পাইতে পারি।
গাছ প্রকৃতিকে স্ব-মহিমায় পরিচ্ছন্ন ইমেজে দাঁড়িয়ে রাখে। এটা স্বাস্হ্যকর পরিবেশ বিদ্যমান রাখার চূড়ান্ত হাতিয়ার। বই-পুস্তক,বিজ্ঞান, ধর্মীয় কিতাব সহ জনমূখে সর্বজন স্বীকৃত এটাই সত্য আওয়াজ।
সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জাত মানবের ঠিকে থাকার অফুরন্ত শক্তিশালী অদৃশ্য যে নিয়ামত অক্সিজেন, তার রুটিন ওয়ার্ক সাপ্লায়ার। শুধু তাই না তার সাথে
যুক্ত আছে জীবন-মৃত্যুর চরম ঐতিহাসিক রেকর্ড।
যার জন্মের জন্য প্রথাগত জন্মকেন্দ্রিক কোন পদ্ধতি বা আনুষ্ঠানিকতা থাকে না। এমনকি জন্মের শুভলগ্নে কোন সুরক্ষিত ঘর,আয়োজন বা জমজমাট পরিবেশের প্রয়োজন হয়না।
বীজ নামের ছোট একটি ঘুমন্ত জিনিস আলো-আধারে মাটির নীচে ঢেকে রাখলেই তার থেকে পুরু মৌসুম ক্ষেত্রমত যুগ থেকে যুগান্তর বাহবা নেওওয়ার প্রাপ্যতা পায়।ভাগ্য, সময় ও পরিবেশের সঠিক সেতুবন্ধন থাকলে বৃক্ষ বেড়ে ওঠতে তেমন বেশি কিছুর দাবী রাখেনা। তবে বহুলাংশে অনাদর ও অযত্নেই বেড়ে ওঠে।এই বেড়ে ওঠায় তাকে সইতেে হয় অনেক যন্ত্রণা, লাঞ্চনা, ও সীমাহীন অত্যাচারেের পরিবেশ। এমনকি সূযোগ পেলে পশু সহ মানুষেরাও তাকে উপড়ে ফেলে ভক্ষণ বা আগুনে দিতেও একটু দ্বিধা করেনা।
সংগ্রাম আর ধৈর্যের লম্বা তিক্ত জার্ণি পেরিয়ে যখন সে পরিণত হয়, তখন চরাচরে প্রাণীকুল তার কাছে ভীড় জমায়। মানুষ তার দেহে লম্বারশি টানিয়ে জামা-কাপড় শুকানোর সখ্যতা গড়ে। গরু,ছাগল,ভেড়া আহার সংগ্রহ করে চূড়ান্ত রিলাক্স মনে তার দেহে গা ঘষাতে বা খামছাতে থাকে। এতে পশুশ্রেণীর দেহ ও মনের যথেষ্ট শান্তির বার্তা থাকে। এক সময় বৃক্ষের নিচে একান্তেই বসে নিজের আহারকে চিবোতে চিবোতে ক্লান্তমনে ঘুমিয়ে পড়ে। পথিক চৈত্রের চরম উত্তেজনা থেকে বাঁচতে তার নিচে ছায়ায় স্বস্তি নেয়। মাঠের কৃষক, শ্রমিক কাজের ফাঁকে ক্লান্ত মনকে প্রশান্তি দিতে তার সান্নিধ্য খোঁজে। এমনকি বসে,বসে বিড়ি, সিগারেট,ছন্দহীন গলায় গান, গল্প ও মোবাইল গেইম শুরুকরে। ছোট বাচ্ছারা গাছে ওঠে একে অন্যের সাথে গল্পে গল্পে মিতালী গড়ে। মাঝে মধ্যে তার জামা-কাপড় (ডাল ভেঙে) ছিড়ে ফেলে।
সময়ে সুযোগে নানা অজুহাতে তার শরীরে মানুষ ধারালো অস্ত্র বসায়। প্রথাগতভাবে শরীর থেকে নিরবে রক্ত বের হয়। কারণে অকারণে তার দেহের সৌন্দর্য সুস্থ সতেজ পাতা ছিড়ে নেয়। সে সবগুলো একান্তে নিজেই নিজের চোখে দেখেও চোখবন্ধ করে ধৈর্য্য ধরে।
তার কাজ সারক্ষণ ধৈর্য্য ধরা। স্বাভাবিকভাবে নিজ অদৃষ্টের বিশ্বাসে বেড়ে ওঠা। যদি কেউ তার জীবনকে সরস,সতেজ বা সেবামূলক ভিটামিনে রসসিক্ত সহ দেখবাল করে এটা তার চরম প্রাপ্তি।
কিন্তু বৃক্ষ কখনো কারো কাছে দয়া বা অনুগ্রহের প্রার্থী হওয়ার নজীর নেই। এটা তার জন্মগত স্বভাববিরুদ্ধ কাজ।
বৃক্ষ নামের এই চিরচেনা প্রচলিত শব্দ
আমাদের জ্ঞানী, গুণী মানবিক সমাজ ব্যবস্হাকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে দেখিয়ে দেয়, আমি বৃক্ষ নিজ মহিমায় বেড়ে ওঠতে অভ্যস্হ। আমি কারো দয়া,অনুগ্রহ বা পলিসির হেল্পের অপেক্ষা করিনা।
যদি পাই এটা আমার স্বাভাবিক প্রাপ্য। এতে আমি তুষ্ট। নেই কোন আলোচনা, নেই কোন সমালোচনার রঙিন মার্কেট।
তারপরেও মানবিক সমাজকে আমার উদারতা,মহানুভবতায় সুযোগ দিয়েছি তারা আমাকে যখন যেভাবে ইচ্ছা তখন সেভাবেই ব্যবহার করে।
আমার বাল্যকালে মনের ইচ্ছামত আমাকে তারা একস্হান থেকে অন্যস্হানে স্হানান্তর করে। এতে আমার অনেক সহোদর সতেজ ও শক্তিশালী হওয়া সত্বেও জায়গা পরিবর্তনে দুনিয়া ত্যাগ করে। নেই কোন আপত্তি। নেই কোন আইনি পদক্ষেপ। দুনিয়া ত্যাগের পরেও আমাকে বা আমার সহোদরকে তারা আগুনে ডুকিয়ে নিজের সুবিধা হাসিল করে।
সবকিছু পেরিয়ে বৃক্ষের যখন চূড়ান্ত যৌবন শুরু হয়, তখন সে তার মহিমা ও স্বপ্ন উপরের দিকেই এগিয়ে রাখে।
কিন্তু যখন তার গর্ভে ফল আসা শুরু হয় তখন সে ক্রমান্বয়ে তার মহিমা ও স্বপ্নকে ভেঙে মস্তককে নিচের দিকে নামিয়ে নেয়। এমনকি ফলের আকার,আকৃতি ও বয়স যত বাড়ে সে ততই বিনয়ী ও নম্র হয়ে নিচমুখী হয়।
ফল পরিপক্ব হলে মালিক ইচ্ছামত কাটতে থাকে। মালিকের আড়ালে অনেক সময় বেমালিকরাও সুযোগ নেয়। শুধু ফলই নেয়
এমন না, প্রায়সময়ই গায়ে শক্ত আঘাত করে। মাঝে মধ্যে বৃক্ষের হাত-পা ভেঙে ফেলে। কিন্তু কখনোই প্রতিবাদের সামান্য শব্দও নেই। একটিবারের জন্যও আক্ষেপের আলামত নেই। তারও জীবন গতিময়।
ফলের সুবিধাভোগ করে মালিক ইচ্ছা করলে তার অনুমতি ছাড়াই তাকে জবাই করে। ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে। প্রয়োজনে নানান দেশীয় অত্যাধুনিক অস্র দিয়ে ঘরের কাজে লাগায়।এতে গাছ টুকরো টুকরো হয়ে যায়। কিছু অংশ লাকড়ি হিসাবে আগুনে ব্যবহার হয়।
শেষ পর্যন্ত মানুষের মৃত্যুর পর গোছলের পানি গরমেও সে আগুনে ডুকে ঐতিহাসিক সাহায্য করে।
এতে বৃক্ষের উপদেশ, আমাদের জানান দেয়।
আমার জন্ম,বেড়ে ওঠা,যৌবন,ফলদান ভাগ্যক্রমে হয়তোবা কিছু সহযোগিতা পেয়েছি,নতুবা আমি আমার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া তথা আল্লাহর ইশারায় বড় হয়েছি। আমি দুনিয়ার কারো দয়া বা অনুগ্রহ চাইনি।
এতকিছুর পরেও আমি পেলাম কী আর বিপরীতে দিলাম কী একটু দেখে নেই।
পেলাম
১/ অনাদর ও অযত্নে বড় হওয়া।
২/ ইচ্ছেমত আমাকে অনুমতিবিহীন স্থানান্তর করা।
৩/বাল্যকালে গরুছাগল মনমত আমাকে ভেঙেছে, মাঝে মধ্যে হাত পা খেয়ে চুপচাপ চলে গেছে।
৪/ প্রায়সময়ই ছোট বাচ্চারা আমার হাত- পা ভেঙেছে।
৫/ বয়সে যখন তরুন তখন ছোট ছোট বাচ্চারা আমার দেহে ওঠে নিজেদের মনমত খেলাসহ নানাগল্পে মশগুল হত।
৬/ ঝড় তুফানে আমি আঘাত পেলে অনেক সময় আমাকে সেবা না করে জবাই করা হয়েছে।
দিলাম
১/কাপড় শুঁকাতে রশি টানানোর সুযোগ।
২/ শত্রু-মিত্র সবাইকে আমার ছায়ায় বিশ্রামের সুযোগ।
৩/পশু শ্রেণীকে তাদের গা খাঁমচানো বা গা ঘেষানোর সুযোগ।
৪/ আামার হাত-পা ভেঙে নিজেদের লাকড়ি তৈরির সুযোগ।
৫/আমার গর্ভজাত সন্তান ফলভোগের অবারিত সুযোগ।
৬/আমার বয়স বেশী হলে সুবিধামত আমাকে জবাই করার সুযোগ।
৭/ শেষদিকে মানুষের মৃত্যুর পর পানি গরমেও আমাকে ব্যবহারের সুযেগ।
এতকিছুর পরেও আমার নেই কোন আপত্তি, নেই কোন বিবাদ,নেই কোন দাবী, নেই কোন কষ্ট, নেই কোন আইনি পদক্ষেপ।
আছে শুধু বিনয়,নম্রতা,ত্যাগ,সহনশীলতা ও মহানুভবতার উতকৃষ্ট উদাহরণ।
এর মধ্যে অসাধারণ শান্তি ও তৃপ্তি খুঁজে পাই।
যার তুলনা আমারটা আমি নিজেই।
আর মানুষ সামান্য কিছু অর্থ বা পদ পেয়ে বসলে অসহায়,গরীব ও বিপদগ্রস্হদের সাহায্যতো দূরের কথা তার চোখে মুখে অহংকার ও ক্ষমতার দাপটের কোন শেষ সীমা থাকেনা।
তাই আসুন,
আমরা বৃক্ষের উপদেশ থেকে ত্যাগ ও মহানুভবতার শিক্ষা নিয়ে নিজের নৈতিক ভিত্তিকে শক্ত করি। তাহলেই বই পুস্তকের সঠিক সভ্যতা আমাদের মন-প্রাণকে রঙিয়ে দিবে। ফলে সমাজের সকল সকলের কাছে সঠিকভাবে স্নেহ,ভালবাসা ও শ্রদ্ধার আসন অলংকৃত করবে ইনশাআল্লাহ।
লেখক: আশ্রাফুল আলম মোঃ নুরুল হুদা
সিনিয়র শিক্ষক (ইসলাম শিক্ষা)
বড়দল উচ্চ বিদ্যালয়,তাহিরপুর,
সুনামগঞ্জ।