আজও ধর্মবর্ণ নিঃর্বিশেষে এলাকাবাসী একজন মানুষের অভাব অনুভব করে। বিশেষ করে যখন এই এলাকায় হানাহানি-ঝগড়া ঝাটি বা মানবসৃষ্ট কোন সংকট উপস্থিত হয়, তখন এলাকার মানুষ দারুনভাবে তাঁর শূন্যতা উপলব্ধি করে। অনেকেই আক্ষেপ করে বলে তিনি জীবিত থাকলে এমনটি হতোনা। তিনি আর কেউ নন তাঁর নাম শেখ লিপাই মিয়া। সমগ্র সিলেট বিভাগ জুড়ে এক নামে পরিচিত ছিলেন। একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, জনপ্রতিনিধি ও সমাজ হিতৈসী হিসেবে সমগ্র দেশ জুরে তাঁর সুখ্যাতি ছিল প্রচুর। যৌবনে ছিলেন একজন নামকরা ফুটবল তারকা। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তিনি ছিলেন গ্রামের মানুষের বিনোদনের মাধ্যম যাত্রাগান এবং বাংলা সংস্কৃতির একজন পৃষ্টপোষক।
শেখ লিপাই মিয়ার জন্ম ১৯২০ সালের পয়লা জানুয়ারী বর্তমান হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার দীগলবাগ ইউনিয়নের বাজু সোনাইত্যা পরগনার কসবা গ্রামে। পিতার নাম শেখ তয়েফ উল্লাহ , মাতা শেখ হাসনমা খাতুন। হাসনমা খাতুন ও তয়েফ উল্লার ছয় পুত্র ও দুই কন্যার মধ্যে তিনি ছিলেন পুত্রদের মধ্যে পঞ্চম । উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত নাহলেও ছিলেন স্মার্ট এবং নর্ম ভদ্র অমায়িক চরিত্রের অধিকারী একজন মানুষ। অনর্গল কথা বলতে পারতেন শুদ্ধ বাংলা হিন্দি ও উর্দুতে। কর্মজীবন শুরু করেন একজন জাহাজি শ্রমিক হিসেবে। জীবনের একটি সময় কাটিয়েছেন ব্রিটেনে। ১৯৪৯ সালে ব্রিটেন থেকে দেশে ফিরে গিয়ে গ্রাম বাংলার মানুষের বিনোদনের জন্য গড়ে তোলেন যাত্রাদল ‘‘কোহিনুর অপেরো‘‘। তখনকার সময় গ্রামবাংলার মানুষের বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম ছিল যাত্রাগান, পালাগান, ঘেটুগান, মঞ্চ নাটক, গাজীরগীত,পুঁথিপাঠ ইত্যাদি। কয়েক বছরের মধ্যেই তার প্রতিষ্ঠিত ‘‘কোহিনুর অপেরা‘‘ সমগ্র বাংলাদেশে দেশ সেরা যাত্রাদলের পরিচিতি লাভ করে। এই যাত্রা দলে কয়েকশ মানুষের কর্ম সংস্থানের সুযোগ হয়। শতাধিক যাত্রা শিল্পি নিয়মিত কাজ করতেন ‘‘কোহিনুর অপেরায়‘‘। বছরের প্রায় ছয়মাস নিয়মিত যাত্রার আসর বা বায়না নাথাকলেও তিনি শিল্পিদের বেতন দিতেন-ভাতা পরিশোধ করতেন, এই দলে যারা কাজ করেছেন কেউ অর্থকষ্টে থাকেনি।
পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ব খান ১৯৫৮ সালে সার্কেল পদ্ধতি বিলুপ্ত করে দেশে ইউনিয়ন কাউন্সিল পদ্ধতির প্রবর্তন করেন। ১৯৬০ সালে প্রথম ইউনিয়ন কাউন্সিল নির্বাচনে সাবেক ৩নং বর্তমান ৪নং দীগলবাক ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের ইউনিয়ন কাউন্সিল সদস্য (মেম্বার) নির্বাচিত হন।
একই বছর নিজগ্রামে বিবিয়ানা (কুশিয়ারা) নদীর তীরে প্রতিষ্টা করেন ‘‘লিপাইগঞ্জ বাজার‘‘ ।

তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই বাজারটি পাঠ ব্যবসার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে সমগ্র দেশে পরিচিতি লাভ করে। নারায়নগঞ্জ সহ সমগ্র বাংলাদেশের পাঠ ব্যাসায়ীরা বড় বড় নৌকা নিয়ে অসতেন পাঠ ক্রয় করতে। এই অঞ্চলে অর্থকরী ফসল হিসেবে প্রচুর পাঠ চাষ করতেন কৃষকেরা। এলাকার চাষীরা যাতে পঠের ন্যায্য মূল্য পায় তিনি এই বিষটি মাথায় রাখতেন সব সময়। সেইসাথে লিপাইগঞ্জে একটি পাঠ রিফাইনারিং কারখানা জুটমিল প্রতিষ্টা করেন। এই কারখানায় নিজ এলাকাসহ দেশের শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়। এখন আর এই এলাকায় পাঠ চাষ হয়না তেমন। এক সময় সমগ্র দেশে পাঠ ব্যবসায় ধ্বশ নামে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত লিপাইগঞ্জ বাজারটির অস্থিত্বও এখন বিলীন হওয়ার উপক্রম । তার প্রতিষ্টিত মিলটিও একসময় বন্ধ হয়ে যায়। তখনকার সময় কসবা ও আশপাশের গ্রামে কোন পোষ্ট অফিস ছিলনা এই এলাকার মানুষেরা ইনাতগঞ্জ এবং দীগলবাগ পোষ্ট অফিসের উপর নির্ভর করতে হতো। গ্রামবাসীর দুর্ভোগ লাঘবে লিপাইগঞ্জ বাজরে নিজে জমি এবং নিজখরচে অবকাঠামো তৈরী করে প্রতিষ্টা করেন লিপাইগঞ্জ বাজার সাবপোষ্ট অফিস। তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই পোষ্ট অফিসটি এখনও তাঁর স্মৃতি বহন করে চলছে। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ইউনিয়ন কাউন্সিল নির্বাচনে ‘‘হুক্কা‘‘ প্রতিক নিয়ে ৪নং দীগলবাক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালের ১লা জানুয়ারী থেকে ১৯৮৪ সালের জানুয়ারী পযর্ন্ত একজন নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে সততা ও নিষ্টার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৫ সালে নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করে সামান্য ভেটের ব্যবধানে হেরে যান, এর পর আর কোন নির্বাচনে অংশ নেননি। তিনি যতদিন চেয়ারম্যান ছিলেন নিজগ্রাম সহ এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল উন্নত। ১৯৭৪ সালে নিজে উদ্যোগী হয়ে লিপাইগঞ্জ বাজারে তাঁর নিজস্ব ভবনে জনতা ব্যাংকের একটি শাখা নিয়ে আসেন। জনতা ব্যাংকের এই ব্রাঞ্চ থেকে এলাকার মানুষ ব্যাংকিং সুবিধা পাচ্ছে। নতুবা এই এলাকার মানুষদের ব্যাংকিং লেনদেনের জন্যে যেতে হতো সিলেট-নবীগঞ্জ বা অন্য কোথাও।


(মতিয়ার চৌধুরী-লন্ডন ২৮মে ২০২৬।)