
বহু সম্মানিত মহতরম জনাব মৌলানা সাহেব সমীপেষু,
আপনি আমাকে পত্র লিখিয়া যে প্রকারে গৌরবান্বিত করিয়াছেন এই প্রকারের সম্মান আমাকে কেহই কস্মিনকালে জানায় নাই। বলা বাহুল্য আমি এ-হেন শ্লাঘা লাভের উপযুক্ত নই। আপনি আমার সশ্রদ্ধ ধন্যবাদ ও হাজার হাজার সালাম গ্রহণ করুন।
আপনি লিখিয়াছেন আপনি কোন কূলকিনারা করিতে পারিতেছেন না।
আশাবাদী রবীন্দ্রনাথ একদা গাহিয়াছিলেনঃ-
“পথের শেষ কোথায়, শেষ কোথায়, কী আছে শেষে?
এত কামনা এত সাধনা কোথায় মেশে?
ঢেউ ওঠে পড়ে কাঁদার, সম্মুখে ঘন আঁধার,
পার আছে কোন দেশে?
আজ ভাবি মনে মনে মরীচিকা অন্বেষণে
বুঝি তৃষ্ণার শেষ নেই, মনে ভয় লাগে সেই-
হাল-ভাঙা পাল-ছেঁড়া ব্যথা চলেছে নিরুদ্দেশে।
কী আছে শেষে।”
কিন্তু তিনি আশা ছাড়েন নাই।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আপনি কূল পাইবেন, কুলায় পাইবেন। আল্লাতালার কাছে সেই প্রার্থনা জানাই।
দেশ গড়িয়া তুলিবার জন্য যাহা লেখা প্রয়োজন, বলা প্রয়োজন তাহা সবল কণ্ঠে বলিবার মত শক্তি আমার থাকিলে আল্লাতালা আমাকে ‘কান-পকড়কে’ লেখাইত, বলাইত। এই বাবদে ইহাই আমার দৃঢ়তম বিশ্বাস। এবং সর্বপ্রথম সর্বশেষ বিশ্বাস- আমার ইমান- গরীব দুঃখীকে যদি অন্নবস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসা ব্যবস্থা না করিয়া দিতে পারিলাম তবে কি কচু হইল স্বাধীনতা লাভ করিয়া?
আপনি আমার জন্য দোয়া করুন, হুজুর যেন আমার কানে ধরিয়া আমাকে দিয়া তাঁহার হুকুম, আপনার খাহেশ, তামীল করাইয়া লয়। আমিন।
X X X
আপনার সহৃদয় পত্র আমার নিকট দেরীতে পৌঁছে। আমি এখন এক আচম্বিত দুর্ঘটনার ফলস্বরূপ শয্যাশায়ী। এখনও তাহার ধকল সম্পূর্ণ কাটে নাই। বিশেষত আপনাকে পত্র লিখিবার মত সাহস আমি কিছুতেই খুঁজিয়া পাই না।
আমি নিশ্চয়ই ‘সন্তোষ’ লাভ করিব। তবে বর্ষাকালে ও সম্ভব হইলে সম্পূর্ণ সফর নৌকাযোগে। তবে আপনার বিনানুমতিতেই একটি ‘বাল্কা’ সঙ্গে লইয়া আসিব। আমার বাপ্, দাদা আমার গোষ্ঠী মোল্লা। ‘বাল্কা’ ভিন্ন বাহির হই কি প্রকারে! তদুপরি আমার স্বাস্থ্য ভালো নয়। ছেলেটি বড়ই সৎ। আপানার ভক্ত, ছাত্রকর্মী। নাম জালাল আহমদ। কলেজে পড়ে। আমার জ্যষ্ঠালির পুত্র। বাল্যকাল হইতেই তাহাকে অন্তরঙ্গরূপে চিনি। নিবাস রাজশাহী।
আমার বহুত বহুত সালাম গ্রহণ করিবেন।
কোনো প্রকারের গোস্তাখী হইয়া থাকিলে মাফ করিতে মরজী হয়।
খাকসার ফকির মুজতবা আলী
প্রসঙ্গ কথা : রাজনীতিবিদ মওলানা ভাসানী সবসময় গুণীর কদর করেছেন। ১৯৪৭ সালের ৩ ও ৪ মার্চের ধুবরি সম্মেলনে এবং ১৯৫৭ সনের ৬-১১ ফেব্রুয়ারির কাগমারী সম্মেলনে শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, সংস্কৃতি সেবী সবার জন্য আলাদা আয়োজন রেখেছেন যাতে তাঁরা জাতি-গঠনে তাঁদের উদার চিন্তাভাবনা সর্বসমক্ষে তুলে ধরতে পারেন। ১৯৭২ সনের এপ্রিলে মওলানা ভাসানী সৈয়দ মুজতবা আলীর সহযোগিতার কথা ভাবেন। তিনি তখন বাংলাদেশেই রয়েছেন। সাক্ষাতে তাঁর সাথে কথা বলার প্রয়োজন বোধ করেছিলেন মওলানা ভাসানী। কারণ তাঁর প্রস্তাবিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। মওলানা ভাসানী যে সৈয়দ মুজতবা আলি সম্পর্কে এত খবর রাখেন আমার ধারণায় ছিল না। আমাকে বললেন, ‘তাঁর দুটোরই অভিজ্ঞতা রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের শান্তি নিকেতন এবং মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়। ভাষা জানেন অনেকগুলো- ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, আরবি, ল্যাটিন, হিন্দি, গুজরাটি, বাংলা-উর্দু তো বটেই।’ সৈয়দ মুজতবা আলী এক সময় বগুড়া আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। তাছাড়া তিনি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং বিশ্বভারতীতে শিক্ষকতা করেছেন। হালকা মেজাজে আড্ডার ঢঙে লিখেও তিনি গাম্ভীর্যপূর্ণ বিশ্বমানবিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা, আন্তর্জাতিক চেতনা, শাস্ত্রচর্চা, বিচার-সমালোচনা তাঁর লেখায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মওলানা ভাসানীর আকর্ষণ এখানেই।
প্রকাশিত চিঠিটিতে সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেছেন। মওলানা ভাসানীর নিকট রবীন্দ্রনাথের দোহাই পেড়েছেন। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয়, ১৯৭২-২০১৭ অর্থাৎ ৪৫ বছরে সৈয়দ মুজতবা আলীর ব্যবহৃত কলমের কালি এতই ফিকে হয়ে গেছে যে উৎসাহী তরুণ-তরুণী ব্যতীত কেউ সৈয়দকে উদ্ধার করতে পারবেনা। ১৯৭৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় তিনি ইন্তেকাল করেন।
আর একটি বিষয়। সৈয়দ মুজতবা আলী চিঠির তারিখ ৪ বৈশাখ ঠিক লিখেছেন। কিন্তু সন ১৩৭২ ভুল লিখেছেন। হবে ১৩৭৯। সন্তোষ পোস্ট অফিসের সিল অনুযায়ী ১৯৭২ সনের ২২ এপ্রিল চিঠিটি সন্তোষে পৌঁছে এবং সেদিনই হুজুরের হাতে আসে।
[ভাসানী সমীপে নিবেদন ইতি, সৈয়দ ইরফানুল বারী]
ফেসবুক থেকে সংগৃহীত