

জন্ম: ১৯৬৮ সনের মে মাসে, সুনামগঞ্জ জেলাধীন জগন্নাথপুর উপজেলার তেরাউতিয়া গ্রামে। পিতা: মশহুর পীর মরমী সাধক কবি, শাহ মোহাম্মদ ইস্কন্দর মিয়া, মাতা: ফুলমালা তালুকদার। পীর শাহ ইস্কন্দর মিয়া ও ফুলমালা তালুকদার দম্পতির পাঁচ সন্তান, যথাক্রমে (১) আফিয়া খাতুন দীপিকা (২) মোহাম্মদ চন্দন মিয়া (৩) মোঃ ইউসুফ মিয়া নুনু (৪) মোহাম্মদ সুলতান মিয়া (৫) মোহাম্মদ আকবর মিয়া।
এর সরল অর্থ:
আমি সাক্ষাতে দেখে বুঝতে পারিনি তিনি একজন স্বভাবগত জাত কবি, কিন্তু তাঁর প্রকাশিত রচনা সম্ভার যখন তিনি আমার হাতে তুলে দিলেন, আমি তা বাড়িতে নিয়ে এসে, মনোযোগ দিয়ে পড়ে বা চেখে দেখলাম এবং বুঝতে পারলাম ইনি একজন উচ্চ মাপের কবি সত্ত্বা।
কবি মোহাম্মদ ইউছুফ মিয়া নুনু সাহেব সহ তাঁরা চার ভাই বিলেত প্রবাসী, কারণ তাঁদের পিতা ১৯৬৩ সালে যুক্তরাজ্যে পাড়ি দিয়ে সপরিবারে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এজন্য কবি পরিবারের তাঁদের একমাত্র বড় বোন বাদে আর সবাই যুক্তরাজ্যের স্থায়ী বাসিন্দা।
সর্বজন শ্রদ্ধেয় লেখক জনাব মতিয়ার চৌধুরী বিলেত প্রবাসী দেশে উনার প্রকাশিত বই বিতরণ উনার পক্ষে সম্ভব নয় সুতরাং উনার সকল বই দেশের সুধী সমাজে বিতরণের দায়িত্বভার তিনি আমাকে তাঁর স্নেহভাজন বিবেচনা করে দিয়েছেন, আমি সে দায়িত্ব সানন্দে গ্রহণ করেছি। এই ধারাবাহিকতায় তিনি আমাকে নির্দেশ দেন কবি ইউছুফ মিয়া নুনু ভাইকে আমি যেন উনার বইগুলো পৌঁছে দেই। বিশেষ করে “বন্ধু ছাড়া কেমনে রই” গীতি গ্রন্থখানা তিনি উৎসর্গ করেছেন কবি ইউছুফ ভাইয়ের মরহুম পিতা: মরমী সাধক কবি, পীর শাহ মোহাম্মদ ইস্কন্দর মিয়া (রহ:) কে, কথা অনুযায়ী আমি উল্লেখিত গানের বই সহ মতিয়ার চৌধুরীর রচিত “নবীগঞ্জের ইতিকথা” “স্থানীয় সরকারের সার্কেল পঞ্চায়েত সরপঞ্চ” ঐতিহাসিক বই দুটি কবি ইউছুফ ভাইয়ের বাড়িতে গিয়ে হস্তান্তর করি। এছাড়া আমার নিজের লেখা কবিতার বই “কল্পতরু” এবং নবীগঞ্জের তরুণ গীতিকার ও কণ্ঠশিল্পী এম মুজিবুর রহমানের লেখা গীতিগ্রন্থ “যতনে গড়া রঙিন ভূবন” বইটি উনাকে উপহার দিয়ে আসি,
আর ফিরতি উপহার স্বরূপ সাথে নিয়ে আসি, কবি মোহাম্মদ ইউছুফ ভাইয়ের রচিত কাব্য ও গীতি গ্রন্থ সম্ভার (১) মেঘ ঝরা বৃষ্টি (২) সুর লহরী তৃতীয় ও চতুর্থ খণ্ড (৩) একুশের সুর (৪) হৃদয় বাংলা (৫) প্রেমপুঞ্জ (৬) মাটির পরশ। এবং উনার পিতার লেখা: ইস্কন্দর গীতি প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড নবম দশম একাদশ ও দ্বাদশ খণ্ড, এছাড়া সৈয়দ মোস্তফা কামাল সম্পাদিত স্মারকগ্রন্থ “বাউল কবি পীর শাহ মোহাম্মদ ইস্কন্দর মিয়া জীবন গাঙের উজান ভাটি” ও মুল্যায়ন পুস্তক ” বাউল কবি পীর মোহাম্মদ শাহ ইস্কন্দর মিয়া বিলাতে সিলেটের সুরময় ভূবনের অ্যাম্বাসেডর, এবং মোহাম্মদ নওয়াব আলী ও কামরুন নাহার চৌধুরী শেফালী সম্পাদিত পীর শাহ মোহাম্মদ ইস্কন্দর মিয়া স্মারকগ্রন্থ, এই সকল অমুল্য অতুল্য রত্নাবলী উপহার।
৯ মে শনিবার সকাল ১১টায় আমরা জামালপুর থেকে অটোরিকশায় পৌঁছাই পাঠকুরা বাজার, সেখান থেকে সামান্য হেঁটে শেওরা খেয়াঘাট পার হয়ে দীঘলবাকের দিকে পশ্চিমমুখী কাঁচা রাস্তায় হন্টন শুরু করি। কিছু দূর গিয়ে হোঁচট খাই, দেখতে পাই রাস্তা নিচু আর সামনে গভীর খাদ, হেঁটে পার হতে কাপড় ভিজে যাবে। আমাদের অসহায়ত্ব অনুমান করে স্থানীয় এক সহৃদয় মহিলা, দূরে একটি ডিঙি নৌকা বাওয়া কিশোর ছেলেকে অনোরুধ করলেন আমাদের কে পার করে দিতে, আপাতত মুশকিল আসান হলো।
আরেকটু এগিয়ে গিয়ে দেখি মস্ত এক ভাঙা, একটি গরু সাঁতরে পার হলো, সুতরাং আমাদের ও সাঁতার দেওয়া ছাড়া উপায় নেই, আশপাশে দেখলাম প্রচুর নৌকা বাঁধা। কিন্তু লোকজন সবাই (নারী পুরুষ) বৈশাখের খরতপ্ত রোদে ধান এবং খড় শুকাতে ব্যস্ত। কেউই নিজের কাজ ফেলে আমাদের কে পার করতে রাজি হলোনা। এর কিছু দূরে, কবি ইউছুফ ভাই আমাদের জন্য নৌকা প্রস্তুত রেখেছিলেন, তিনি জানতেন এখান পর্যন্ত আমরা পায়ে হেঁটে আসব, কিন্তু তাঁর আগেই আমরা আটকে গেছি।
উনাকে ফোনে জানালাম, তিনি নৌকার লোককে ফোন করে বললেন আরো অগ্রসর হয়ে আমাদের কে রিসিভ করতে, এবং আমাদের কাছে নৌকা বাহকের ফোন নম্বর দিলেন, উভয় পক্ষে যোগাযোগ হলো নৌকা এলো। আমরা ভব সাগর পাড়ি দিয়ে, সরাসরি তেরাউতিয়া গ্রামে, কবি গৃহের সামনের রাস্তার কিনারে, নৌঙর ফেলে তীরে উঠলাম, তখন দুপুর দেড়টা।
ড্রয়িং রুমে ঢুকে দেখলাম আরো দুজন মেহমান বসে রয়েছেন, তাঁদের সাথে করমর্দন করে বসলাম। ছিমছাম সাজানো বসার ঘর, একপাশে দেখলাম ঢোল তবলা হারমনি, একজন কিংবদন্তী গীতিকবির বসতবাড়ি, উনার সন্তান গানের সমঝদার মোহাম্মদ ইউছুফ মিয়া নুনু কবি ও গীতিকার, বাদ্যযন্ত্র থাকাটাই স্বাভাবিক।
অতঃপর আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে স্বয়ং গৃহকর্তা এলেন করমর্দন কোলাকুলি হলো পরিচয় বিনিময় হলো।
জানতে পারলাম আমাদের পূর্বে আগন্তুক দুজনের পরিচয়, একজন বাউল শিল্পী ফকির শাহ মোঃ বাবুল মিয়া, অন্যজন তাঁর সাথে ঢোল তবলা বাদক, মোঃ লাল মিয়া। বুঝতে বাকি রইলো না আমাদের সম্মানে গানের জলসা হবে। শীতল সফট ড্রিংকস চা নাস্তা হলো, আমরা বই বিনিময় করলাম, সৌজন্য আলাপচারিতায় হৃদ্যতা হলো, তারপর শুরু হলো গান, বাউল শিল্পী বাবুল ভাই প্রথমে গলা ছেড়ে গাইলেন মরহুম পীর শাহ ইস্কন্দর গীতিকার একটি গান, তারপর গাইলেন মতিয়ার চৌধুরীর “বন্ধু ছাড়া কেমনে রই গীতি গ্রন্থের দুটি গান, তাঁর সঙ্গে বাদ্যযন্ত্র সঙ্গত করলেন, মন্দিরায়: আব্দুল মালিক, ঢোলক: মোঃ লাল মিয়া। আমি শেওরা থেকে আলাগদি পর্যন্ত ভবের সাগর (স্থানীয় হাওর) নৌকা যোগে পাড়ি দিয়ে এলাম, আর শেষ পর্যন্ত মরমী কবি সাধকের গৃহেই, উনারা শিষ্য সন্তান তুল্য, ফকির বাবুল শাহ’র সুললিত কন্ঠের, গান শুনতে শুনতে ভাব সাগরে ডুবে সুরের স্রোতে ভেসে গেলাম।
গান শেষ হলো কিছুক্ষণ পিনপতন নীরবতা, বেলা গড়িয়ে বিকেল হয়েছে, গানের সুধা পান করে ক্ষুদা ভুলে গিয়েছিলাম। মনে করিয়ে দিলেন স্বয়ং কবি ইউছুফ ভাই, ডাকলেন খাবার টেবিলে যেতে। খাবার আয়োজন ব্যাপক, হরেক পদের মাছের তরকারি,আর মাংস, গৃহকর্তা যত্ন করে খাওয়ালেন সবাইকে।
খাওয়া শেষে যাওয়ার পালা। তার আগে মরহুম কবি পীর শাহ মোহাম্মদ ইস্কন্দর মিয়া (রহ) ও তদীয় সহধর্মিণী মরহুমা ফুলমালা তালুকদার এর মাজার জিয়ারত করলাম। পরে বিদায় নিলাম ইউছুফ ভাইয়ের কাছ থেকে। তিনি নিজস্ব নৌকা বাহক সহ নৌকা দিলেন, আমাদের কে শেওরা পর্যন্ত পৌঁছে দিতে।